পতিসরে  রবীন্দ্রনাথের কৃষি সমবায় ব্যাংক

পতিসরে রবীন্দ্রনাথের কৃষি সমবায় ব্যাংক

এম মতিউর রহমান মামুনঃ ‘ তোমরা যে পার এবং যেখানে পার এক- একটি গ্রামের ভার গ্রহণ করিয়া সেখানে গিয়ে আশ্রয় লও। গ্রামগুলিকে ব্যাবস্থাবদ্ধ করো। শিক্ষা দাও, কৃষি শিল্প ও গ্রামের ব্যাবহার-সামগ্রী সন্বন্ধে নতুন চেষ্টা প্রবর্তিত করো।’ ( রবীন্দ্রনাথ রচনাবলী ১০ম খন্ড ) কালীগ্রাম পরগনার পল্লীগঠণের কাজে হাত দিয়ে রবীন্দ্রনাথ খুব সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন কৃষকদের অর্থনৈতিক দুরবস্থা।
শোষিত বঞ্চিত কৃষকদের বাস্তব অবস্থা অবলোকন  করে এক চিঠিতে লিখলেন ‘কোথায় প্যারিসের আর্টিস্ট সম্প্রদায়ের উদ্দাম উন্মত্ততা আর কোথায় আমার কালীগ্রামের সরল চাষী প্রজাদের দুঃখ দৈন্য-নিবেদন! এদের অকৃতিম ভালোবাসা এবং এদের অসহ্য কষ্ট দেখলে আমার চোখে জ্বল আসে।… বাস্তবিক এরা যেন আমার একটি দেশ জোড়া বৃহৎ পরিবারের লোক” (ছিন্নপত্র ১১১)।  রবীন্দ্রনাথ নিজ অন্তরের মাঝে আনমনে এঁকেছিলেন গরীব হতভাগ্য প্রজাদের ছবি  ‘ অন্তরের মধ্যে আমিও যে এদেরই মতো দরিদ্র সুখদুঃখ কাতর মানুষ, পৃথিবীতে আমারও কত ছোট ছোট বিষয়ে দরবার, কত সামান্য কারণে মর্মান্তিক কান্না, কত লোকের প্রসন্নতার উপরে জীবনের নির্ভর! এই সমস্ত ছেলেপিলে-গোরুলাঙল-ঘরকান্না -ওয়ালা সরল হৃদয় চাষাভুষোরা আমাকে কী ভুলই জানে! আমাকে এদের সমজাতি মানুষ বলেই জানেনা। আমাকে এখানকার প্রজারা যদি ঠিক জানত, তাহলে আপনাদের একজন বলে চিনতে পারত’।(ছিন্নপত্রাবলী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী ১৩৯৯ পৃষ্টা ৩৭)
রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন কৃষক সমাজ  মহাজনদের কাছে তাঁরা ঋণী, এখান থেকে মুক্ত করতে না পারলে তাঁদের পক্ষে কোন কাজে যোগ দেওয়া সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথ অস্থির হয়ে উঠলেন কীভাবে ঋণগ্রস্থ গ্রামবাসীকে ঋণমুক্ত করার কার্যকারী সাহায্যের ব্যাবস্থা করা যায়। শেষ পর্যন্ত বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় পরিজনের কাছে ধার দেনা করে পতিসর ব্যাংক খুললেন নাম  ‘পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংক’ উদ্দেশ্য স্বল্প সুদে প্রজাদের টাকা ধার দিয়ে মহাজনের গ্রাস থেকে তাঁদের মুক্ত করে অর্থবৃত্তে স্বাবলম্বী করা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘পতিসরে আমি কিছুকাল হইতে পল্লীসমাজ গড়িবার চেষ্টা করিতেছি যাহাতে দরিদ্র চাষী প্রজারা নিজেরা একত্র মিলিয়া দারিদ্র, অস্বাস্থ ও অজ্ঞান দূর করিতে পারে—প্রায় ৬০০ পল্লী লইয়া কাজ ফাঁদিয়াছি…..আমরা যে টাকা দিই ও প্রজারা যে টাকা উঠায়..এই টাকা ইহারা নিজে কমিটি করিয়া ব্যায় করে। ইহারা ইতিমধ্যে অনেক কাজ করিয়াছে’ ( পল্লীপ্রকৃতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী, ১৯৬২ পৃষ্ঠা ২৬১)

তাই গবেষকরা মনে করেন, ‘রবীন্দ্রনাথের  পল্লীসমাজ পরিকল্পনার সর্বত্তোম প্রকাশ যদি গণতান্ত্রিক গ্রামীণ পঞ্চায়েত ব্যাবস্থায় এবং এর অর্থনৈতিক  ভিত্তি সর্বজনীন সমবায় ব্যাবস্থায় ঘটে থাকে, তাহলে সে সমবায় চিন্তার অসামান্য প্রকাশ ঘটেছে পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংক স্থাপনে। ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ফলে  গ্রামের শোষিত মানুষেরা ভয়াবহ মহাজনী ঋণের কবল থেকে মুক্তি পেল, কৃষক -কৃষির   উন্নতি হলো, গ্রামের মানুষ শিক্ষার সুযোগ পেল স্বাস্থ সেবার উন্নয়ন হলো । রবীন্দ্রনাথের পল্লীউন্নয়ন ও পল্লীসমাজ গঠনের চেষ্টায় কৃষি ব্যাংক  প্রতিষ্ঠি ছিল একটি অসাধারণ মাইলফলক’ (রবীন্দ্র ভূবনে পতিসর আহমদ রফিক)।

আজ শত  বছর পরে  আমাদের দেশে গ্রামীণ মানুষের উন্নতির জন্য বে-সরকারী কিছু সংস্থা (এন,জি, ও) ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের দিকে তাকিয়ে অবাক হতে হয় এই ভেবে যে, শত বছর আগে রবীন্দ্রনাথ পল্লীউন্নয়ন ও পল্লীগঠণের কাজে কি গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদর্শিতার পরিচয় রেখেছিলেন পতিসরে। ব্রিটিশ বঙ্গে যখন সমবায় কার্যক্রম শুরু হয়নি; ‘ কোঅপারেটিভ ব্যাংক, লোন কম্পানি যখন ছিলোনা তখন পতিসরের মতো অখ্যাত পল্লীগ্রামে কৃষি ব্যাংক খুলে কৃষকদের ঋণমুক্ত হতে সহযোগিতা করা তা অসান্য কর্মদক্ষতারই উধাহরণ ।  সংগত কারণে ধরে নেওয়া যায়
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্ম যেখানে গ্রামের  ধুলো -কাদা- মাটির স্পর্শ নিয়ে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, ভালোবাসা, দেশপ্রেম প্রতিফলিত হয়েছে, যে মাটির মাঝে মায়ের অসিত্ব কল্পনা করে শ্রদ্ধায় মাথা নূয়ে স্বর্গকে কল্পনা করেছেন সেখানে পতিসরের দানই প্রধান। আর সৃষ্টিকর্মের কথা বাদ দিলে পতিসরের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায় এই জন্য যে, রবীন্দ্রানথ সাহিত্য সাধনার বাইরে পল্লী পূর্নগঠন কর্মকান্ডের যা কিছু সাফল্য তা পতিসরে এবং কৃষি সমবায় ব্যাংক ছিল তাঁর সর্বত্তোম প্রকাশ।
  রবীন্দ্রনাথ নিজ জমিদারী পতিসরে পল্লীউন্নয়ন কাজটা শুরু করেছিলেন ১৯০৫ সালে।  তাঁর  ইচ্ছাছিল স্বল্প আয়ের অল্প শিক্ষিত  সাধারণ মানুষের উন্নয়ন করা। কেননা  গ্রামের সংখ্যাগোরিষ্ঠ মানুষকে পিছিয়ে রেখে  উন্নত সমাজ বা রাষ্ট্র গঠণ সম্ভব নয়। আর অর্থবৃত্তে সাবলম্বী হতে না পারলে শিক্ষার উন্নতীও  অচিন্তনীয় । সেই লক্ষে পতিসরে স্কুল, দাতব্য চিকিৎসালয়, অধুনিক কৃষি ব্যাবস্থার পাশাপাশি গরীব প্রজাদের সহজ সর্তে ঋণ দানের জন্য  কৃষি সমবায় ব্যাংক গঠণ করেছিলেন তা তৎকালীন  ভারতের বিরল ঘটনাই বলা যায়। ব্যাংক চলেছিলো পঁচিশ বছর  বাংলা১৩২০ থেকে ১৩৪৫ সাল পর্যন্ত ( সম্প্রতি উদ্ধার কৃত বরীন্দ্রনাথের কৃষি ব্যাংকের লেজারের হিসাব অনুযায়ী)  আর অমিতাভ চৌধুরী  লিখেছেন, “ব্যাংক চলেছে কুড়ি বছর। ” প্রথমে ধারদেনা করে   ১৯০৫ সালে পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করার পর কৃষকদের মধ্যে ব্যাংক এতোই জনপ্রিয় হয়ে উঠে যে, তাঁদের ঋণের চাহিদা মিটানো স্বল্প শক্তির এ ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব ছিলনা। অবশ্য সমস্যার কিছুটা সমাধান হয় নোবেল পুরস্কারের টাকা ১৯১৪ সালের প্রথম দিকে কৃষি ব্যাংকে জমা হওয়ার পর। কত টকা ব্যাংকে মূলধোন ছিল তা নিয়েও মতোভেদ আছে কেউ বলছেন এক লক্ষ আট হাজার আবার অনেকে লিখেছেন এক লক্ষ আটাত্তোর হাজার টাকা’। (রবীন্দ্র জীবনী প্রশান্ত কুমার পাল ২য় পৃ. ৪৬২)। শুধু নবেল আর ধারদেনার টাকাই নয়, ব্যাংকের অবস্থা অস্থিতিশীল দেখে ১৯১৭ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বইয়ের রিয়্যালটি এবং আমেরিকায় বক্তৃতা বাবদ প্রাপ্ত টাকা থেকে ন’হাজার টাকা জমা দেন। তবুও শেষ পর্যন্তু ব্যাংক আর টিকলোনা।
কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘পিতৃস্মৃিতি’তে লিখেছেন ‘ ব্যাংক খোলার পর বহু গরীর প্রজা প্রথম সুযোগ পেল ঋণমুক্ত হওয়ার। কৃষি ব্যাংকের কাজ কিন্ত বন্ধ হয়ে গেলল যখন Rural indebtedness -এর আইন প্রবর্তন হলো। প্রজাদের ধার দেওয়া টাকা আদায়ের উপায় রইল না’। ব্যাংকের শেষ অবস্থা নিরীক্ষণ করে ১৯১৪ সালে ডিসেম্বর মাসে কবিগুরু প্রমথ চৌধুরীকে বার বার অনুরোধ করে  লিখেছেন ‘ দোহায় তোমার যত শ্রীঘ্র পার ব্যাংটাকে জয়েন্ট ষ্টক কোম্পানিতে পরিণত করে নাও ( রবীন্দ্র জীবনী প্রশান্ত কুমার পাল খন্ড ৭ পৃষ্টা ২৯৭)  কিন্তু কবির সে অনুরোধ শতর্কবাণী রাখা হয়নি, ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেল রবীন্দ্রনাথের সকল স্বপ্ন শেষ করে দিয়ে।
রবীন্দ্রনাথ পতিসর আসা যাওয়া করেছেন ৪৬ বছর ( ইংরেজী ১৮৯১সালোর ১৩ ই জানুয়ারী থেকে ১৯৩৭ সালের ২৭ জুলাই পর্যন্ত)। এই দীর্ঘ ৪৬ বছরের পতিসরে তাঁর বর্নাঢ কর্মময় জীবনে রেখে গিয়েছিলেন অনেক মধুমাখা অনেক স্মৃতি। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গিয়েছিলো সবকিছুই। একজন বাঙালি হিসাবে সেই মধুমাখা স্মৃতিচিহ্ন  উদ্ধার ও সংরক্ষণ আমাদের দ্বায়িত্বের মধ্যই পরে। ২০০৩ সাল থেকে রবীন্দ্রস্মৃতি উদ্ধার ও সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণা  শুরু করছিলাম শেষ করেছি ২০০৯ সালে। উদ্দেশ্য ছিল পঞ্চাশ দশকে জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির সময় পতিসর রবীন্দ্র কাচারী বাড়ি থেকে যে সমস্ত রবীন্দ্রস্মৃতি চিহ্ন হারিয়ে গিয়েছিল তা পূনরায় উদ্ধার করে পতিসরে পূর্ণঙ্গ রবীন্দ্র মিউজিয়াম করা। বেস কিছু গুরুত্বপূর্ন  রবীন্দ্রস্মৃতি উদ্ধার করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে হস্তান্তর করেছি । তবে  নতুন এক অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম  বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত ‘ পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংকের ‘ হিসাবের মহামূল্যবান লেজার টি উদ্ধার করার পর। মূল্যবান খাতা  হাতে আসার পর  তা নিয়ে আমরা গবেষণা করছিলাম, কারণ এমন লেজার দুই রাংলার কোথায় নেই।
পতিসর  কৃষিব্যাংকের  তথ্যাদি শুধু  গবেষকদের কলমেই ছিল, বাস্তব এ ধরণের কোন খাতা-পত্র ছিলনা।  গবেষণা পর যখন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগণ  বুঝতে পারলেন এটা রবীন্দ্রনাথের কৃষিব্যাংকের  হিসাবের খাতা তখন ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে বেশ কিছু কাগজে এ সংক্রান্ত  প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  কৃষিব্যাংকের দীর্ঘ  পঁচিশ  বছরের  যাবতীয় তথ্যাদি তুলে ধরেন।  তাতে দেশে ও দেশের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক গণ তা দেখতে পতিসরে এসেছেন। আমরা হয়তো তার কদর আজও জানিনি, বুঝিনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারী পরিচালনার কাজে এসে পতিসরের প্রজা সাধারণের কষ্ট, দুঃখ, যন্ত্রনা ও অসহায়  গ্রমীণ মানুষের  বেঁচে থাকার প্রকৃিত রুপ অবলোকন করে তাঁদের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে দাসত্ব গোলামীর জিঞ্জির থেকে রক্ষা করতেই চেয়েছেন।
‘আন্যদিকে গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলোর প্রতি ‘ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা বহনের মধ্যদিয়ে রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেন গ্রামীণ জীবনযাত্রার সারল্য, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার মতো স্থায়ী ভাবসম্পদ যা তাঁর নান্দনিক চৈতন্য বিশেষ মূল্যবান হয়ে উঠে’ ( রবীন্দ্রভুবনে পতিসর আহমদ রফিক) । তাই তিনি পতিসরের মতো অখ্যাত গ্রামে  কৃষি ব্যাংক করতে ভুল করেন নি। তাতে কৃষক মহাজনের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছেন অন্যদিকে শিক্ষা আর্জন সম্ভব হয়েছে । অথ্যাৎ অর্থ বৃত্তের সঙ্গে শিক্ষার যোগসুত্র বোধ করেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পতিসরে কৃষিব্যাংক স্থাপন করেছিলেন। বলতে লজ্জা লাগে কিছু পূর্বে রবীন্দ্রনাথের কৃষি ব্যাংকের প্রতি সন্মান দেখিয়ে পতিসরে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের শাখা করা হল কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কোন করণ ছাড়াই তা রাতারাতি স্থানান্তরিত করা হয়েছে। আজও  ব্যাংক পতিসর বাসী ফিরে পায়নি, এটাই কি রবীন্দ্র শ্রদ্ধার নমুনা?  আমাদের ভেবে দেখা দরকার রবীন্দ্রনাথের পল্লী উন্নয়ন ভাবনা ছিল এ দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির অন্যতম সোপান। তার প্রকাশ পতিসরের কৃষি সমবায় ব্যাংক।
লেখক ঃ রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক
ফোনঃ ০১৭১৪৯৪৩৫৬৭

Leave a Comment