প্রধানমন্ত্রীর ৪৮৪ অনুশাসন বাস্তবায়নে বিশেষ উদ্যোগ

প্রধানমন্ত্রীর ৪৮৪ অনুশাসন বাস্তবায়নে বিশেষ উদ্যোগ

জনস্বার্থ এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে গত সাড়ে ১০ বছরে ২৪৯টি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে ৪৮৪টি অনুশাসন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এগুলো বাস্তবায়নে বিশেষ তদারকির উদ্যোগ নিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এরই অংশ হিসেবে ২০০৯ সাল থেকে জুন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সব অনুশাসন নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

আগামী একনেক বৈঠকে এটি উপস্থাপন করা হবে। এরপরই প্রতিবেদনটি সব মন্ত্রী, সচিব, জেলা প্রশাসক এবং প্রকল্প পরিচালকদের কাছে পাঠানো হবে, যাতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এসব অনুশাসন মেনে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারেন।

পরিকল্পনা সচিব মো. নূরুল আমিন বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, দারিদ্র্য নিরসন, কৌশল ও অর্থনৈতিক কর্মপন্থা নিরূপণে একনেক ও এনইসির বৈঠকগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

এজন্যই বই আকারে প্রতিবেদন তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অনুশাসনগুলোর অধিকাংশই বাস্তবায়ন হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, কোনো অনুশাসন একদিনে বাস্তবায়নের বিষয় নয়, দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়ন করতে হয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর সব অনুশাসন যাতে বাস্তবায়ন করা হয় সেজন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে একনেকের ১০টি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন ছিল ২৫টি। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ২৪টি একনেকে ৫৩টি অনুশাসন, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৪ একনেকে ২৩টি, ২০১১-১২ অর্থবছরে পাঁচটি একনেকে ছয়টি, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৬টি একনেকে ৭টি, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১৪টি একনেকে ২৪টি, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২৩টি একনেকে ৫৭টি, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২৭টি একনেকে ৮৩টি, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৫টি একনেকে ৮৮টি, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২২টি একনেকে ৫৮টি এবং চলতি অর্থবছরে (জুন পর্যন্ত) ১৯টি একনেক বৈঠকে ৫৮ অনুশাসন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী জনস্বার্থের পাশাপাশি উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে নানা সময়ে বিভিন্ন অনুশাসন দিয়েছেন। এগুলো বাস্তবায়ন জরুরি। কিন্তু কোন অনুশাসন যদি বাস্তবায়ন করা না হয়, তাহলে কেন হয়নি তারও জবাবদিহিতা থাকতে হবে।

তাছাড়া বাস্তবায়ন পর্যায়ে কোনো জটিলতা থাকলে সেগুলোও উপস্থাপন করা দরকার। সেই সঙ্গে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো যাতে অনুশাসনগুলো ভুলে না যায় সেদিক থেকে বই আকারে প্রতিবেদন তৈরির উদ্যোগটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো বিষয়ের নিয়মিত মনিটরিং থাকতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি সব মন্ত্রণালয়ের জন্য অনুশাসন দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, প্রকল্প শুধু ভবন নির্মাণ, গাড়ি ও আনুষঙ্গিক কাজের জন্য নয়। জনসেবার জন্য প্রকল্প গ্রহণ ও অর্থ ব্যয় করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলছে বলে জানা গেছে।

একই দিনে সব রাস্তার পাশে এক স্তর নিচু করে রাস্তার দু’পাশ দিয়ে আরেকটি রাস্তা নির্মাণের অনুশাসন দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, মূল রাস্তার পাশের রাস্তা দিয়ে যাতে রিকশা, ভ্যান, মানুষ এবং ধীরগতির যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে।

ইতিমধ্যেই এ অনুশাসন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ অনুশাসনগুলোর মধ্যে রয়েছে- দেশব্যাপী রেলপথে বিদ্যমান সেতুর অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত সমীক্ষার পর পর্যায়ক্রমে রেল সেতুগুলো মেরামত বা পুনর্বাসন, সসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ইন্সটিটিউটে চিকিৎসকরা কর্মস্থলে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে হবে।

পুরান ঢাকার নিমতলী ও চুড়িহাট্টা দুর্ঘটনার মতো ভবিষ্যতে যাতে কোনো ঘটনা না ঘটে সেজন্য পুরান ঢাকার বিদ্যমান রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ক্রমেই কৃষি জমি নষ্ট করা যাবে না। প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের অগ্রিম পরিকল্পনা করতে হবে।

খাল ও উন্মুক্ত জলাশয় অবৈধ দখল মুক্ত করতে হবে। কৃষি জমি অপচয় রোধে নতুন সড়ক নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান সড়ক উন্নয়ন করতে হবে। ঢাকা শহরের ফুটপাত রক্ষায় ফুটপাতের হকারদের পুনর্বাসনের জন্য বন্ধের দিনগুলোতে নির্দিষ্ট স্থানে সাপ্তাহিক মার্কেট বসানোর দিন ধার্য করতে হবে।

উপকূলীয় অঞ্চলে সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের সময় অবশ্যই ছাদে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য ইনহাউজ ওয়াটার রিজার্ভারের সংস্থান, শেল্টারগুলোতে সোলার প্যানেল এবং আশ্রিতদের মূল্যবান সামগ্রী রাখতে শেল্টারে স্টোর রুম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

এছাড়া ঢাকা শহরের সব সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ে উপ-বৃত্তি দিতে হবে। ভবিষ্যতে যমুনা নদীতে টানেল নির্মাণের লক্ষ্যে সেতু বিভাগ থেকে একটি ফিজিবিলিটি স্টাডির উদ্যোগ, দেশি ফল উৎপাদন বৃদ্ধি ও গবেষণার মাধ্যমে গুণগত মান বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়ার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।

রোহিঙ্গাদের জন্য প্রকল্প গ্রহণের সময় এলাকাবাসীকে সুবিধা দেয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। পাহাড় যাতে ধসে না পড়ে সেজন্য পর্যাপ্ত রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণসহ পর্যাপ্ত গাছ ও ঘাস লাগাতে হবে।

Leave a Comment